দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চলতি মাসের ৮ অক্টোবর থেকে বঙ্গোপসাগরে মা ইলিশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের জলসীমায় শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। যা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। তবে ভারতের জলসীমায় এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। ফলে যখন বাংলাদেশি জেলেরা সমুদ্রে যেতে না পেরে কর্মহীন হয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন, তখন সমুদ্রে নির্বিঘ্নে মাছ ধরছেন ভারতীয় জেলেরা। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয় পাশাপাশি বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে নিংস্ব হচ্ছে অনেক জেলে পরিবার। নিষেধাজ্ঞার সময় সাগরে নজরদারি কতটা কার্যকর, অবৈধভাবে মাছ ধরা কতটা বন্ধ করা যাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রকৃত জেলেরা কতটা লাভবান হচ্ছেন এসব নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বার বার নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশে এক বছরে জেলেদের জন্য ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন সামুদ্রিক মাছের প্রজনন রক্ষার জন্য ৫৮ দিন, মা ইলিশ সংরক্ষণে অক্টোবর মাসে ২২ দিন, তেতুলিয়া নদী অভায়শ্রমে মার্চ-এপ্রিল ২ মাস এবং পহেলা নভেম্বর থেকে ৩০ জুন জাটকা ধরায় ৮ মাস থাকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা।
এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, কালবৈশাখীসহ আবহাওয়াজনিত প্রতিকূলতা তো আছেই। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২৫০–২৭০ দিন কোনো না কোনো কারণে মাছ ধরা বন্ধ থাকে পটুয়াখালীর উপকূলে।শুধু মাছ ধরা বন্ধই নয় এসময় মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুতও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে।

জেলেদের ক্ষোভ ও সংকটের কারণ
সীমান্ত বৈষম্য,ঋনের বোঝা এবং অপর্যাপ্ত সরকারি সহায়তাকে দায়ী করছেন জেলেরা।একই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ অংশে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও ভারতের অংশে মাছ ধরা চালু থাকে। এই সুযোগে ভারতীয় জেলেরা আধুনিক ট্রলার নিয়ে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে ইলিশ শিকার করে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জেলেরা। শুধু নিষেধাজ্ঞা না বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দূর্যোগকে কেন্দ্র করে উপকূলের প্রায় সময়ে প্রায় ১ লাখেরও বেশি জেলে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েন। দাদন ও এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাই এক সমুদ্রে দুই নিয়মকেই দায়ী করছেন জেলেরা।
গবেষকদের মতামত
বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮৬ ভাগই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশের জলসীমায়, আর মাত্র ১৪ ভাগ ভারত ও মিয়ানমারে। গত ১০ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ।যদিও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২রা অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১১ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন করে। ফলে এক সমুদ্রে চলছে দুই নিয়ম।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলি বলেন, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে জেলেদের জন্য ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে দেখতে হবে, এই নিষেধাজ্ঞা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না।
প্রকৃত জেলেরা যখন নিষেধাজ্ঞা মেনে নৌকা ঘাটে রাখছেন, তখন যদি অন্য কোনো পক্ষ অবৈধভাবে মাছ আহরণ করে, তাহলে সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তা, কঠোর নজরদারি এবং সমুদ্রে সবার জন্য একই আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা হবে, অন্যদিকে জেলেদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।

সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
একই সমুদ্র, অথচ নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতায় জেলেদের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে দুই ধরনের নিয়ম। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে প্রতিবছরের মত এ বছরও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নৌপুলিশ, কোষ্টগার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগ। অবৈধভাবে মাছ ধরতে নামা ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, প্রস্তুত রয়েছে অভিযান পরিচালনাকারী দল।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দাবি
পটুয়াখালিতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে জেলের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এর মধ্যো নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৮০ হাজার। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু চাল-ডালই নয় পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানমূলক কাজ বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জেলেদের।
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দি বলেন,‘ এক সমুদ্রে দুই নিয়ম নিয়ে জেলেদের অনেক ক্ষোভ। সরকারি দপ্তরে বিষয়গুলো আমরা উপস্থাপন করব পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলেদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার প্রচারনা চলমান রাখা হয়েছে। খেটে খাওয়া এসকল জেলেদের মাঝে নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই ২৫ কেজি করে চাল বিতরন করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেরা যাতে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টিও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এই নিষেধাজ্ঞা সফল হলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত জেলেদেরই উপকার করবে।’
সাগর বাঁচাতে নিষেধাজ্ঞা, আর জেলেদের বাঁচাতে কার্যকর সহায়তা এই দুইয়ের সমন্বয়ই এখন উপকূলের মানুষের প্রধান দাবি।
কেএম